SORRY দীপান্বিতা

ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি।
ক্যাম্পাসে বলতে ভার্সিটির গেটে। আমি, নিলয়,
তুহিন, শফিক। খুব ভাল বন্ধু আমরা। যেদিকে যাই
চারজন একসাথেই যাই। ওহ হ্যা আমার নাম দীপ।
এবার অনার্স থার্ড ইয়ার। কেমেস্ট্রি বিভাগ।
,
গল্পে গল্পেই জেনে যাবেন আমাদের কার কি রকম
চরিত্র? ধৈর্য্য সহকারে পড়ুন।
.
নিলয় আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল –
:- ঈশ! মাম্মাহ কি মাল যাচ্ছেরে!
:- কই? দেখি, দেখি……. ।
:- ঐ যে।
:- হ হাচাই ত।
আমি আর নিলয় কথাগুলো বলছিলাম। আর তুহিন তো
মেয়েটির দিকে এক চাওয়া দিয়েছে যেন চোখের
পলক আর পড়তেই চায় না বা আর ফেলবেই না।
আমি তুহিনকে বললাম।
:- কিরে তুহিন্না? অমন করে কি চাইয়া দেখিস?
:- এই চুপ যা। বিরক্ত করিস না। তগো ভাবিরে দেখি।
এইবার বাপেরে ধইরা বিয়া কইরাই ফালামু।
তুহিন কথাগুলো আমাদের দিকে না তাকিয়েই বলল।
এক পলকেই তাকিয়ে ছিল মেয়েটির দিকে।
:- এই তুহিন্না!
এটা বলেই মাথায় এক চাপড় দিলাম। মনে ছিল না।
ওর মাথায় চাপড় দিলে খুব ক্ষেপে যায়। প্রচন্ড
রকমের ক্ষেপে গিয়ে আমাকে মারতে উদ্যত হল আর
একটা গালি দিয়ে কথা বলল।
:- কোন শালারে! মাথায় চাপড় মারলি?
সোজা হয়ে দাড়িয়ে দেখে আমি। তুহিন আমাকে
অনেক মানে তাই ঘোরে দাড়িয়েই সে স্তব্ধ হয়ে
গেল। আমি এর থেকে জোরে মারলেও তুহিন
আমাকে কিছুই বলবে না। অন্যকেউ হলে এতক্ষণে
একদফা কিল ঘুষি হয়ে যেত। বিশেষ করে নিলয়
মারলে এতক্ষণে কিল ঘুষির সাথে লাথি উষ্টাও
খেতে হত নিলয়ের। নিলয়ের সাথে পুরোণো এক
শত্রুতা আছে। সেই শত্রুতার কারণ ছিল মেঘা।
মেঘাকে তুহিন ভীষণ পছন্দ করত। কিন্তু নিলয় নিজের
করে নিতে চাইছিল। শেষে নিলয় বা তুহিন কারো হল
না। এর থেকেই নিলয়ের প্রতি তুহিনের একটু রাগ
আছে।
.
আমার প্রতি তুহিনের বিশেষ দুর্বলতা আছে। কিন্তু
কি সেই দুর্বলতা তা আমি আজো জানতে পারলাম
না। অনেক চেষ্টা করেছি জানতে কিন্তু জানতে
পারি নি।
.
সেদিনের মত ভার্সিটি ত্যাগ করলাম।
নিলয় আর শফিক রাস্তাতেই নেমে গেল।
আমি আর তুহিন রয়ে গেলাম। একটু পরেই তুহিনের
বাসা পরে আমার।
তুহিনকে ঠাট্রা করেই বললাম।
:- কিরে তুহিন? মেয়েটাকে মনে ধরছে?
:- হ। খুব।
:- মনে ধরছে ভাল কথা। তাই বলে এভাবে তাকিয়ে
থাকবি? তুই জানস না। মেয়েদের দিকে একবারের
বেশী তাকানো নাজায়েজ।
:- আমি তো একবারের বেশী তাকাই নি। এক পলকেই
দেখেছি। যতদূর দেখা যায় আর কী!
:- দূর হ্লা। তুই মরেও শোধরাবি না।
:- হ দোস্ত। যাইরে।
:- আচ্ছা যা।
.
সবার পরে হল আমার বাসা। তুহিনের বাসা থেকেও
আমার বাসায় যেতে পাক্কা দশমিনিট লাগে। এই
সময়টুকু খুব বোরিং লাগে। একা একা যেতে হয়।
.
বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হলাম। কিছু খেয়ে দেয়ে দিলাম
এক ঘুম। এক ঘুমেই বিকাল পাঁচটা।
.
এমন সময় কল্পনার ফোন।
:- কি রে বান্দর! ফোন ধরস না ক্যারে?
:- ঘুমাইছিলাম।
:- তুহিন কই?
:- আমি কি জানি?
:- তুহিনের ফোন তো বন্ধ।
:- এই নিয়ে এত দু:শ্চিন্তা করার কি আছে? হয়তো
ফোনে চার্জ নাই। নাহয় ফোন অফ করে নাক ডেকে
ঘুমাচ্ছে।
:- সারাদিন কথা বলতে পারিনাই রে!
.
এই হল কল্পনা। তুহিনের গার্লফ্রেন্ড। থুক্কু কল্পনা
তুহিনকে এক তরফা ভালবাসে। কিন্তু তুহিন এখনো
সাড়া দেয় নি। কল্পনা আমাকে সব বলে। তুহিনকে
বুঝাতেও বলে। কিন্তু তুহিন কি আমার কথা মানবে?
তাই এতদিনেও বুঝানো হয় নি।
.
তুহিনকে খুব ভালবাসে মেয়েটি। কল্পনা আমাদের
ফ্রেন্ড সার্কেলের মধ্যে হলেও আমাদের চারজনের
মত বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে উঠতে পারেনি।
শফিক আর নিলয়ের কথা কি বলব? উনারা ছ্যাকা
খেয়ে ব্যাকা হয়ে গিয়ে আর কোন প্রেমের জালে
ফাঁসবে না এমন সিদ্ধান্তেই অটল। আমাদের সাথে
থাকে, মজা করে এই পর্যন্তই। এর বাইরে তারা যায়
না। যা করার আমি আর তুহিনই করি।
.
প্রতিদিনকার রুটিন মত আবারো চার জন গিয়ে
ক্যাম্পাসে হাজির । অবস্থান বকুল তলা।
এখনো বুঝতে পারেন নি? আমাদের কি কাজ?
ক্লিয়ার করে বলছি। ভার্সিটির সবচেয়ে
ডেঞ্জারাস ও টাউট পোলা হলাম আমরা চারজন।
চারজনের গ্রুপের লিডার আমি। আমার কথাতেই এরা
কার্যক্রম ঘটায়।
আমি ধনী বা বড়লোক বাবা মায়ের বখে যাওয়া
সন্তান। কুলাঙ্গারও বলা চলে। যখন কেউ এই নামে
ডাকত তখন আমার মাথায় আগুন ধরে যেত। আস্তে
আস্তে সব সয়ে গেছে। এখন আর আগের মত রাগি না।
আমাদের নিত্যদিনের কাজ হল মেয়েদের টীজ করা,
বিভিন্ন উপায়ে অপদস্ত করা। বেশী কিছু হলে
দুয়েকটা চড় থাপ্পড় দেওয়া। এইতো আমাদের
ভার্সিটি জীবন। ক্লাসের টিচাররা এখনো জানেই
আমরা এই ভার্সিটিরই ছাত্র তাও আবার
কেমেস্ট্রির। জোর খাটিয়ে, ক্ষমতা দেখিয়ে এই
তিনবছর পার করেছি। একটা পরীক্ষাতেও পড়ে পাশ
করতে পারি নি। যা পাশ করছি ক্ষমতার জোরে।
সবাই আমাদের খারাপ বলত। এমনকি স্যারেরাও।
আমরা ট্যাগকৃত খারাপ হইলেও। আমাদের একটা ভাল
গুন আছে। কি জানেন? অন্য ভার্সিটির কোন
পোলাপান এই ভার্সিটিতে এসে উল্টাপাল্টা কিছু
করতে পারত না। যদি শুনত সে এই কলেজের মেয়ে
তাহলে বখাটেরা তাকে আপা বলে সম্মান করত।
এইদিক দিয়ে আমাদের কলেজের মেয়েরা অনেক
সেভ ছিল।
.
কলেজ প্রাঙ্গণে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। এমন সময়
সেই মেয়েটি যাচ্ছিল। তুহিন শিস মারল । আর
ইশারায় ডাকল।
মেয়েটি কাছে আসল। তুহিনকে উদ্দেশ্য করে বলল।
:- ভাইয়া কিছু বলবেন?
:- ঈশরে! আমি তোমার কোন জনমের ভাই?
:- কেন? কলেজের বড় ভাই।
:- মানে?
:- আপনি তুহিন। আর উনি দীপ। এইবার থার্ড ইয়ার।
কেমেস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট । ঠিক বলেছি না?
.
আমি তো মেয়ের কথা শুনে থ মেরে দাড়িয়ে
গেলাম। কি বলে মেয়েটা? আমাদের নারী নক্ষত্র
সব জানে দেখছি। এই ভেবে খুব ভাল লাগল যে, এই
মেয়েটাও আমাদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানে।
তারমানে আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কেউ।
তুহিন বলা শুরু করল।
:- হ্যা। ঠিকই বলেছ।
আমি শুধু আশ্চর্য হয়েই যাচ্ছি। কেননা এই প্রথম তুহিন
শুদ্ধ ভাষায় কথা বলল। তাও আবার সামান্য একটা
মেয়ের কারণে। তুহিনের কার্যক্রম দেখে হাসি
পাচ্ছিল আর মেয়েটির কথায় মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম।
দুইয়ে মিলে চুপচাপ রইলাম।
.
মেয়েটি বলল,
:- কি হল কিছু বলছেন না যে?
:- না না কিছু না। তুমি যাও।
:- ওকে আসি ভাইয়্যা।
:- যাও।
,
মেয়েটি চলে গেল। আমি ভালমতই বুঝতেছিলাম।
তুহিন মেয়েটির সামনে খুব অস্বাচ্ছন্দ্য ফিল
করতেছে। তাই মেয়েটিকে কিছু না বলে তাড়িয়ে
দিল।
মেয়েটিও আমাদের মতই বজ্জাত হবে মনে হয়। যেই
না সামনের দিকে তাকাইছি। তখনি মেয়েটি চোখ
মারল। আমরা দুজনই তাকিয়েছিলাম কিন্তু কার
দিকে চোখ মারল কিছুই বুঝলাম না।
মেয়েটি সামনে থেকে চলে গেল। মেয়েটির আর
কোন অস্তিত্বই নেই।
এমন সময় তুহিন আমাকে বলল,
:- হ্যারে দীপ। আমার এমন হল কেন? কখনো তো এমন
হয় নি?
:- কেমন?
:- এই যে সামনে পেয়েও মেয়েটিকে কিছুই বলতে
পারলাম না। গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছিলই না।
:- মাম্মা। তুই ধরা খাইছিস রে!
:- কিসের ধরা?
:- প্রেমের ধরা। আমি নিশ্চিত তুই ঐ মেয়ের প্রেমে
পড়ে গেছিস।
:- আচ্ছা দীপ। মেয়েটির নাম কিরে?
:- আমি তো জানি না।
:- দেখছোস। আমরা কতটা মাথামোটা! মেয়েটা
আমাদের সব জানে কিন্তু আমরা কিছুই জানি না।
.
সেদিনের মতও বাসায় চলে আসলাম। কয়েকদিন পরে।
ক্যাম্পাসে একই জায়গায় বসে আছি। অন্য এক
মেয়েকে টীজ করার জন্য ডাক দিল। যেই কিছু বলতে
যাবে তখন দেখে সেই মেয়েটি গেট দিয়ে ঢুকতেছে।
তুহিন আর কিছুই বলতে পারল না। মেয়েটিকে ভাল
মন্দ কিছু জিজ্ঞেস করে ছেড়ে দিল। সেদিনও
কাউকে র্যাগিং করা গেল না। ঐদিনের মেয়েটি
কাছে আসতেই তুহিন একেবারে চুপসে গেল।
মেয়েটি নিজেই এগিয়ে এল। আর বলল,
:- কি হল ভাইয়্যারা? আজ র্যাগিং করবেন না?
:-…….
তুহিন কথার কোন উত্তরই দিল না। উত্তর দিবে
কেমনে? আর র্যাগিং ই কেমনে করবে? মেয়েটা যে
নিজেই র্যাগিং হতে এসেছে। যে নিজে আসে
তাকে কি র্যাগিং করা যায়?
তুহিনের কাছ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে চলে
যাচ্ছিল। এইবার আমিই ডাক দিলাম।
:- এই মেয়ে শোন?
:- জ্বী বলুন।
:- নাম কি তোমার?
:- দীপা।
:- খুব ভাল নাম। কিসে পড় ?
:- আপনাদের ভার্সিটিতেই ফিজিক্সে প্রথম ইয়ার।
:- অসাম। যাও তবে।
:- হুম্মম।
আমি একটা জিনিস খেয়াল করে দেখলাম। যখন
তুহিনের সাথে কথা বলত তখন দীপা উপরে তাকিয়েই
কথা বলত কিন্তু আমার সাথে মাথা নীচু করেই
বলেছে।
.
মেয়েটি চলে গেল। আমাদের র্যাগিং করার
অবস্থায় বারোটা বাজতে চলেছে। তুহিন এই কাজটা
ভাল পারে। কিন্তু সেই এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে।
দীপার প্রতি ভীষণ দুর্বল হয়ে গেছে।
র্যাগিং করার দায়িত্বটা এখন আমাকেই নিতে হবে।
যদিও এই কাজটা আমি ভাল পারি না। তবুও ধরে
রাখার জন্য আমাকেই ধরতে হবে। কাল থেকে আমিই
র্যাগিং করব।
শফিক আর নিলয় তো এসবের ধারে কাছেও আসে না
এখন। তারা ভাল হতে চায়। ভাল না হলে নাকি ভাল
মেয়ে পাওয়া যাবে না।
.
যথারীতি পরের দিন এসে হাজির। উদ্দেশ্য।
র্যাগিং করব। কিন্তু কাউকে ডাক দিতে পারছি না।
কেমন যেন লজ্জা লজ্জা লাগে। অনেকেই ছোট
বোনের বয়সী। এদেরকে কেমনে র্যাগিং করব।
বিবেকে বাধা দেয়। ধুরর কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।
তুহিন শালাও গিয়ে প্রেমেই পড়ল।
.
হঠাৎ করেই আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। একমাস
ভার্সিটিতে যাই না। কারো সাথে তেমন কোন
যোগাযোগও নাই। সুস্থ হতে আর ভার্সিটিতে
যাওয়ার মনমানুষিকতা তৈরী হতে মাস খানেক সময়
লেগেই গেল। বেস্ট স্টুডেন্ট গুলোর ক্ষেত্রে
আলাদা। তারা বড়জোর একসপ্তাহ যেত না। পরে
ঠিকই যেত। আমরা চারজন ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছি।
একেকজন একেক দিকে ছুটছে। কেউ আর র্যাগিং
নিয়ে ভাবি না।
.
একমাস পরে কাধে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে
ভার্সিটিতে প্রবেশ করলাম। কেমন যেন লাগছিল।
অনেকটাই লজ্জা লজ্জা ভাব। সবাই হা করে
তাকিয়ে আছে। কিন্তু কেন হা করে আছে সেটাই
ভাববার বিষয়। আমাকে এমন ভাবে দেখছে যেন
আমাকে কখনোই দেখেনি। ব্যাপার টা তখনি
অস্বাভাবিক লাগল যখন কেমেস্ট্রি ম্যাডাম আমার
দিকে হা করে তাকিয়েছিল। কী ব্যাপার সবাই এমন
হা করে তাকিয়ে আছে কেন? সবার হা করে
তাকিয়ে থাকা দেখে সেই বকুল তলায় আবার এসে
বসলাম। দূর থেকে একটা মেয়ে এগিয়ে আসছে
কালো পোশাক গায়ে তার। অসম্ভব সুন্দরীদের একজন
মনে হচ্ছে। কিন্তু কে সে ? আগে কখনো দেখছি বলে
মনে হয় না। যতই কাছে আসতেছে ততই মুখটা ক্লিয়ার
হচ্ছে। একটু কাছে আসতেই মেয়েটাকে চিনে
ফেললাম। এ যে দীপা। এই একমাসে মেয়েটা অনেক
সুন্দর হইছে। খুব মায়াবী চেহারাও বটে। খুব মায়াবী
লাগছে তাকে সে কালো ড্রেস পড়েছে বলে।
একটু পর শিউর হলাম ধেয়ে আমার দিকেই আসছে।
কাছে এসেই টুপ করে পাশে থাকা বেঞ্চটায় বসে
পড়ল। খুব স্বাভাবিক কন্ঠেই কথা বলল,
:- কেমন আছেন আপনি?
:- এইতো ভাল।
:- শুধুই ভাল।
:- শুধুই ভাল?
:- হুম্ম।
:- আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না। আমি কেমন আছি?
:- কেমন আছেন?
:- যেমন দেখতে পাচ্ছেন।
:- ওহহ।
আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম। দীপা স্বাভাবিক
ভাবেই কথা বলতে চাচ্ছিল কিন্তু তার কথাবার্তায়
অস্বাভাবিকতা ফুটে উঠছিল। সে মোটেই
স্বাভাবিক না।
.
আমি চুপটি মেরে বসে আছি। সে আবার জিজ্ঞেস
করল।
:- কই ছিলেন? ভার্সিটিতে আসেন নি কেন?
:- একটু অসুস্থ ছিলাম।
:- অসুস্থ? কই, কাউকে তো কিছু জানান নি?
:- কেন? ওরা সবাই তো জানে।
:- ওরা কারা?
:- নিলয়, শফিক, তুহিন, কল্পনা।
:- কচু জানে। তাহলে ওরা আপনার ব্যাপারে আমার
কাছে খোজ করছিল কেন ?
.
এই কাম সারছেরে। ধরা খাইয়া গেলাম দেখি। কেউ
জানে না। আমার অসুস্থের কথা। ইচ্ছা করেই কাউকে
জানাই নি। কিন্তু আমার প্রতি মেয়েটার এত আগ্রহ
কেন? কেন আমার খোজ খবর রাখে। এই
অস্বাভাবিকতার কারণ কি তাহলে আমিই? কিন্তু
কেন? আমি হব কেন? এইরকম অনেক প্রশ্ন মনের মধ্যে
ঘুরপাক খেতে লাগল। শেষে যেই প্রশ্নটা মনে উদিত
হল সেটা হল গিয়ে। তাহলে দীপা কি আমাকে
ভালবাসে?
.
ধুরর! কিসব ভাবছি আমি? ও আমাকে ভালবাসতে
যাবে কেন? তুহিন তো ওকে ভালবাসে। এতদিনে
হয়তো অনেকদূর এগিয়ে গেছে। কিন্তু ওর বাচনভঙ্গি
অন্যকথা বলছে। অন্যদিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যাক এটা নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে। যখন সময়
হবে তখন নাহয় ঘামাব। কিছুক্ষণ পরে দেখি দীপাও
আমাকে দেখে হাসছে। কিন্তু এই মেয়ে হাসছে
কেন?
আমি ধমকের সুরেই বললাম।
:- এই মেয়ে হাসছ কেন?
:- হা হা হা। এমনি।
ধমক খেয়েও হাসছে।
:- না। এমনি নয়। কিজন্য হাসছ তাই বল।
:- আপনাকে কখনো ট্রাইজার পরে আর ব্যাগ নিয়ে
ভার্সিটিতে আসতে দেখিনি তো তাই হাসছি।
নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি
সত্যিই তো ট্রাউজার পরেই বের হইছি। এত লজ্জা কই
রাখব? ভেবে পাচ্ছি না। ভেবেছিলাম আজকে
স্যারের লেকচার শুনব কিন্তু এইভাবে লেকচার শুনতে
যাওয়া যাবে না। এটা ভেবেই গেটের দিকে পা
বাড়ালাম। পিছন থেকে দীপা ডাক দিল।
:- এই যে! কোথায় যাচ্ছেন?
:- দেখতেই তো পাচ্ছেন গেটের দিকে যাচ্ছি।
:- উহু আমি সেটা বলিনি। এখান থেকে বের হবার পর
কোথায় যাবেন?
:- বাসায় যাব। যাবেন?
রাগ করেই কথাটা বললাম।
:- উহু যাব না। অন্য কোথায় হলে যেতাম।
কিছু না বলে চলে আসতেছিলাম। সে দৌড়ে আসল।
এসেই হাতটি ধরে ফেলল। আবার বলল।
:- বাহ রে! আপনি কেমন মানুষ বলুন তো?
মুখে কিছু না বলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দীপার দিকে
তাকিয়ে রইলাম।
সে বলল,
:- আপনি একটা আস্ত মাথামোটা। একটা মেয়ে
নিজে থেকে আপনার সাথে কোথাও ঘুরতে যেতে
চাইছে। আর আপনি কিনা তাকে রেখেই চলে
যাচ্ছেন?
:- কি?
:- জ্বী! চলেন।
:- কোথায়?
:- আপাতত আপনার বাসায়। পরে পার্কে বা কোন
নির্জন স্থানে।
:- কি বলছেন এসব? আপনাকে নিয়ে বাসায় যাব
কেন? আর আপনাকে বাসায় নিলে আব্বা আমাকে
আস্ত রাখবে না। আব্বা প্রচন্ড রাগী আর
বদমেজাজি।
:- উহু। উনি খুব ভাল মানুষ। প্রচন্ড বদমেজাজি আর
রাগীরাই অনেক ভাল মনের হয়। আর কি বললেন?
আমি বাসায় যাব? না। বাসায় যাচ্ছি না। নিচে
কোথাও অপেক্ষা করব। আপনি এই ড্রেস পাল্টায়ে
আসবেন তারপর আমাকে নিয়ে ঘুরতে যাবেন।
:- আমি পারব না।
:- কি?
এমন ভাবে তাকাল যেন একেবারে পুরাই রিনা
খানের লুক। আমি আর কিছু বললাম না।
.
আপনারা হয়তো বুঝে গেছেন দীপা আমার সাথে
প্রেম করতে চায়। আমিও বুঝেছিলাম কিন্তু অনেক
পরে।
.
দীপাকে নিয়ে রিক্সা করে বাসার কাছে আসলাম।
পরবর্তীতে ঝামেলা হবে ভেবে তাকে আর বাসা
চিনাই নি। বাসা থেকে পাঁচ মিনিটের দুরত্বের
রাস্তায় তাকে নামিয়ে দিলাম। আর বললাম
অপেক্ষা করেন আমি আসতেছি।
.
পাক্কা বিশ মিনিট বসিয়ে রেখে পরে এসেছি।
আমি ভেবেছিলাম আমার দেরী দেখে হয়তো চলে
যাবে। কিন্তু যায় নি। এখনো বসে আছে।
আমি ভাবলাম হয়তো অনেক রেগে আছে। একরকম
ভয়ে ভয়েই কাছে গেলাম। আর মানুষিক ভাবে
প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম কিছু কটু কথা হজম করার জন্য।
কাছে যাইতেই খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
:- আসছেন তাহলে?
:- হুম্ম।
:-:চলেন।
:- কোথায়?
:- সাফারি পার্কে। গাড়িতে করে জীব জন্তু দেখব।
:- আচ্ছা চলেন।
.
যে মেয়ে রাগে তাকে রাগানো যায় কিন্তু এই
মেয়েকে রাগাতেই পারছি না। রাগাতে পারলেই
এর সঙ্গ ত্যাগ করা সহজ হয়ে যাবে।
কিছুক্ষণের মধ্যে সাফারী পার্কে পৌছোলাম।
পার্কে কি যাব? গেটের বাইরে যে বিশাল
জায়গাটা আছে সেখানেই অনেক ভাল লাগছে। তাই
আর ভিতরে গেলাম না।
.
ফুসকা, চচটপটি খেয়ে বাইরেই কিছুক্ষণ আড্ডা
দিলাম। সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়তেছিল
তখন টিকেট কেটে ভিতরে গেলাম। পুকুরের সামনে
একটা বেঞ্চে বসে হাসগুলোর লীলাখেলা আর
নৌকার আসা যাওয়া দেখতেছিলাম।
আমি একটু একটু করে দীপার দিকে খেয়াল করে
দেখলাম। সে একটু সিরিয়াস মোডে আছে। হঠাৎ
করেই বলে উঠল।
:- আমি কি আপনাকে খুব বিরক্তি করি?
:- হঠাৎ এই প্রশ্ন উঠে আসল কেন?
:- উত্তর টা দিন।
:- কই না তো।
:- আপনি এই একমাস ভার্সিটিতে আসেন নি কেন?
:- বললাম না অসুস্থ ছিলাম।
:- জানেন আপনাকে অনেক মিস করেছি এই কয়দিন।
কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ উদাও হয়ে গেলেন। আর
কেউ কিছু জানে না। আবার একমাস পরে ফিরে
আসলেন।
:- আমাকে মিস করেছেন, মানে?
:- বয়রা নাকি? কানে কম শুনেন?
:- আমাকে কেন মিস করেছেন? অন্যকেউ তো করে
না।
:- অনেকেই করে। কিন্তু কেউ আপনাকে বলে না। আর
সেই টুকু বুঝার মত বুদ্ধি আপনার মাথায় নেই।
:- আপনি কি আমাকে ভালবাসেন?
:- এতদিনে বুঝলেন তাহলে? যাক বুঝতে তো পারছেন
এটাই অনেক। আমিতো ভেবেছিলাম আপনাকে
নিজে থেকেই প্রোপোজ করতে হবে।
:- আমি বুঝতে পারতাম কিন্তু সেটা বন্ধুত্ব নাকি
প্রেম! শিউর ছিলাম না।
:- আপনাকে আমার প্রথম থেকেই ভাল লাগছে। যখন
আপনার বন্ধুরা র্যাগিং করত আপনি চুপ করে বসে
থাকতেন। তখন ব্যাপারটা অন্যরকম লেগেছে। পরে
খোজ নিয়ে জানতে পারি। আপনি এইরকম না।
সবকিছুর মূলে তুহিন।
:- আমি এই দলের লিডার ছিলাম। হয়তো মুখে কিছুই
বলতাম না। সব পরিকল্পনা আমারই ছিল। সেই
পরিকল্পনা মোতাবেক তুহিন কাজ চালাত।
:- ওহ।
:- আমার মত বিভ্রান্ত বাউন্ডেলে মানুষ কে কেন
ভালবাসতে গেলেন। আমাকে ভালবাসা মানে খাল
কেটে ঘরে কুমীর আনা।
:- হোক তবুও ভালবাসি। কিন্তু একটা সমস্যা আছে।
:- কি সমস্যা?
:- আপনি আর এইসব করতে পারবেন না। এই সব বাদ
দিয়ে ভাল করে পড়ালেখা শুরু করবেন।
:- আমার একটা সমস্যা আছে।
:- আবার কিসের সমস্যা?
:- আমাকে দিয়ে সব হবে কিন্তু মাগার পড়াশোনা
হবে না।
:- থাপড়ায়ে একদম দাঁত ফেলে দেব।
:- আমি আপনার সিনিয়র। সম্মান দিয়ে কথা বলুন।
:- তাতে কি হইছে! এখন আপনি আমার ইয়ে মানে
প্রেমিক। আপনার ভালমন্দ দেখার দায়িত্ব আমার।
:- এহহহহ! আইছে অধিকার দেখাইতে। দুইদিন পরে
কইব। স্যরি আপনার সাথে আমি আর কন্টিনিউ করতে
পারছি না। ভাল থাকবেন।
:- মাইর খাওয়ার ইচ্ছা আছে?
:- না। নাই। মাইয়্যা মানুষের হাতে মাইর খাওয়ার
কোন ইচ্ছাই নাই।
:- তাহলে যেন এমন কথা আর না শুনি!
.
ধুরর! আগেই তো ভাল ছিল। কেন প্রেমেতে
জড়াইলাম? এখন তো প্যারার উপরেই দিন যাবে।
,
কিছুদিন পরে শুনি। তুহিন, কল্পনার সাথে চুটিয়ে
প্রেম করছে। কেমনে যে কি হইল? আর কিছুই জানি
না। শুধু এইটুকুই জানি। আর আমাদের ব্যাপারে সবই
তো জানেন। দীপ আর দীপা ভালবাসায় জড়াইয়া
গেছে।
.
এক বছর পর :
দীপ মানে আমি চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা
দিয়েছি। রেজাল্টও হয়ে যাবে কিছু দিন পর। এখন
তো আর ভার্সিটি তে আসতে পারি না। দীপাকেও
দেখতে পারি না। তাকে একটু দেখার জন্য গেটে
দাড়িয়ে থাকি। ফোনে ও চ্যাটে কথা হয়। মাঝে
মাঝে দেখাও হয়। এখন খুব ব্যস্ত সময় পার করছে। তাই
আগের মত সময় দিতে পারে না। চরম ব্যস্ততার
মাঝেও সে আমাকে সময় দেয়। যতটুকু সময় না দিলে
প্রেমের দেওয়ালে ফাঁটল ধরবে। ও চায় না আমাদের
সম্পর্কে ফাঁটল ধরুক। এর মাঝে রাগ করে তিনমাস
কথা বলি নি। পরে তুহিন এসে আমাদের কথা বলায়।
আবার চলতে থাকে আমাদের প্রেম। এই সামান্য একটু
ভুল বোঝাবুঝি হইছিল তাই কেউ কারো সাথে
তিনমাস কথা বলি নি। কিন্তু কেউ কাউকে দেখা
ছাড়া থাকতে পারতাম না। তাই যেকোন কৌশলেই
হোক দেখা করতাম। লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম ভালই
লাগছিল।
হঠাৎ করেই জরুরী তলব করল সেই চীরচেনা সাফারী
পার্কে। দুইজন এক বেঞ্চেই বসে আছি পাশাপাশি।
আমি কথা বলা শুরু করলাম।
:- এইভাবেই বসে থাকবা নাকি কিজন্য ডেকেছ
সেটা বলবা?
:- তোমার তো রেজাল্ট হয়ে যাবে। রেজাল্টের পরে
আর কি পড়াশোনা করবা?
:- না। আর ইচ্ছা নাই।
:- তাহলে জব করবা?
:- তাও না।
:- তো কি করবা?
:- গ্রামে চলে যাব। সেখানে গিয়ে ছোট করে
ব্যবসা শুরু করব।
:- এতদূর লেখাপড়া করে চাকরী না করে ব্যবসা
করবা? এটা কেমন দেখায়।
:- যেমনই দেখাক। লোকে যাই বলুক আমি কারো
গোলামি করতে পারব না। আর লেখাপড়া করলেই যে
চাকুরী করতে হবে এটা কেমন কথা? আর সবাই যে
চাকুরীর জন্যই পড়াশোনা করে তা কিন্তু ঠিক নয়।
অনেকেই সম্মান পাবার আশায় লেখাপড়া করে।
:- তুমি বলতে চাচ্ছ। তুমি কেবল সম্মানের জন্যই
পড়াশোনা করেছ।
:- হ্যা তাই।
:- তুমি তো নষ্টের পথে পা বাড়াচ্ছিলে আমি
তোমাকে ভালবেসে ভুল রাস্তা থেকে ফিরিয়ে
এনে লেখাপড়ায় মনোযোগী করালাম। তাতে আমার
তো কিছু চাবার থাকেই নাকি বল তুমি?
:- হ্যা তাতো বটেই। তারমানে তুমি বলতে চাচ্ছ আমি
চাকুরী করি?
:- না। আমি সেটা বলছি না। আমি বলছি যে, চাকুরী
ই কর আর ব্যবসাই কর কোন আপত্তি নাই। শুধু খেয়াল
রেখ কেউ যেন বলতে না পারে দীপ ছোট খাট
ব্যাবসা করে। বড় ব্যবসা শুরু করবা। শুরুর দিকে তুমিই
সামলাবা। আমি লেখাপড়া শেষ করে তোমার
ব্যবসার পাশে দাড়াব।
:- এইটুকুই তোমার চাওয়া?
:- জ্বী জনাব। শহরে থাকতে থাকতে হাপিয়ে
উঠেছি। গ্রামে গিয়ে বুক ভরে মুক্ত বাতাস নিতে
চাই।
:- চল এবার উঠি।
:- হুম্ম চল।
.
পার্ক থেকে বেরিয়ে একটা রিক্সা নিয়ে দুজনে
ফিরে আসতে লাগলাম। দীপা রিক্সাওয়ালাকে
ইঙ্গিত দিয়ে ডান দিকে যেতে বলল।
.
কথামত রিক্সাও ডানদিকে ছুটে চলল।
আমি দীপাকে বললাম।
:- কি ব্যাপার! এদিকে কেন?
:- কাজী অফিসে।
:- ওখানে কেন?
:- ওমা তুমি জান না। মানুষ কাজী অফিসে কেন যায়?
:- তাতো জানিই। ফ্রেন্ড সার্কেলের কেউ বিয়ে
করতেছে নাকি?
:- আরে বলদ। তুমি আর আমি আজ বিয়ে করব। দেখছ
না শাড়ি পড়ে এসেছি। আর তোমাকে পাঞ্জাবি
পড়ে আসতে বলেছি।
:- তাই বলে এভাবে কাউকে না জানিয়ে?
:- সবাই জানে। কেবল তোমার আর আমার বাবা মা
ছাড়া।
:- এটা কি ঠিক হচ্ছে?
:- হুম্ম। খুব হচ্ছে। আচ্ছা আমার সাথে যে তোমার
এতদিনের রিলেশন তাতে তোমার কোন ক্ষতি আমি
চাইছি।
:- না চাওনি। হয়তো সেটা তোমার অভিনয়। ফুসলিয়ে
বিয়ে করে পরে আমার জীবনটা তেজপাতা করে
দিবে।
.
এই কথা শুনার পরেই দীপা আমার হাত ছেড়ে দিল।
আমিও ভাবলাম হয়তো ভুল করে ফেলছি কথাটি বলে।
কিন্তু আমি ওকে পরীক্ষা করছিলাম। আসলেই এমন
কোন উদ্দেশ্য তার মাঝে আছে নাকি! কিন্তু হাত
ছেড়ে দেওয়াতে বুঝলাম। ওর মাঝে কোন খারাপ
উদ্দেশ্য নাই। সত্যিই আমাকে ভালবাসে। কিন্তু
ততক্ষণে ও রাগে ফুসতে শুরু করে দিয়েছে। ওর রাগ
ভাঙানোর মন্ত্র আমি জানি। কি করে তার রাগ
ভাঙতে হয়। আলতো করে তার মাথাটি ধরে আমার
বুকের উপরে চেপে ধরলাম। পাঁচ মিনিট পরে সব রাগ
মাটি হয়ে গেল। একটু ভালবাসলেই মেয়েটির কঠিন
রাগও মাটি হয়ে যায়। যত রাগই করুক না কেন বুকে
টেনে নিলেই হল। আর আমার রাগ ভাঙানোর মন্ত্র
সেও জানে। ছোট বেলা থেকেই আমার কাতুকুতু
বেশী। আমার পেটের বাম আর ডানপাশে কাতুকুতু
দিলেই রাগ পানি হয়ে যায়। অন্যভাবে রাগ কমতে
সময় লাগে। এই ভাবে বড়জোর পাঁচ সাত মিনিট।
নিচের দিকে তাকিয়ে থাকলেও রাগ ভাঙে কিন্তু
প্রায় আধা ঘন্টার মত লাগে।
,
দশ পনের মিনিট পরে কাজী অফিসের সামনে
গেলাম। গিয়ে তো রাগও উঠছে হাসিও পাচ্ছে।
কেননা সব বান্দরগুলো আগে এসেই বসে আছে।
আমাকে সারপ্রাইজ দেবে বলে। অনেক সারপ্রাইজড
হয়ে ছিলাম আমি। কিন্তু সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজড
হলাম যখন দেখলাম দীপার বাবা ও আমার বাবা
গলায় হাত দিয়ে ধরাধরি করে বের হচ্ছে। তখন আর
বুঝার বাকি রইল না। আমার অজান্তেই অনেক কিছু
হয়ে গেছে।
.
পরে তুহিন সব ক্লিয়ার করে বলেছে। সেই নাকি
আমার বাব আর দীপার বাবাকে রাজি করিয়ে
এখানে নিয়ে এসেছে। দীপাও জানত না। ওর বাবা
এখানে আসবে সহজে আমাদের কে মেনে নিবে।
দীপাও তো খুশিতে একরকম কেঁদেই দিয়েছে।
আমাদের মিলনের বড় বাধাই ছিল দীপার বাবা।
কেমনে যে কি হইল? বুঝতে পারলাম না। বুঝতেও চাই
না আর। সবাই উপস্থিত থেকে বিয়েটা সেরেই
ফেললাম। শেষে ফাইনাল হল দুই মাস পরে অনুষ্ঠান
করে দীপাকে উঠিয়ে দেবে। এখন আপাতত দীপাকে
দীপার বাবা সাথে নিয়ে যাচ্ছে। দুইমাস পরে
একবারে দিয়ে দিবে। সাময়িক বিরতি আমার কাছে
বিষের মত লাগছিল তবুও মেনে নিলাম। ফোনে
যোগাযোগ তো হবেই। নাহয় এই দুই মাস না দেখে শুধু
কথাই বললাম।
.
আমার কেন যেন ভয় হত দীপাকে আর আমার হাতে
দিবে না। সিনেমাতেও দেখেছি এমনটা হতে। খুব
সহজভাবে মেনে নেয়। পরে আর কারো সাথে
যোগাযোগ করতে দেয় না। জোর করে অন্য জায়গায়
বিয়ে দিয়ে দেয়। বড়লোকের কারবারই এমন। দীপার
বাবাও অনেক বড়লোক ছিলেন। আমার বাবা বড়লোক
ছিলেন না। তবে কোটিপতি ছিলেন। হা হা হা।
জাতে জাতে না মিললে নাকি আত্মীয় হয় না।
বড়লোক আর বড়লোক মিলেছে তারপরেই কিছু হইছে।
দীপার বাবা প্রচন্ড প্রেম বিরোধী ছিলেন। যদিও
নিজেই প্রেম করে বিয়ে করেছেন। প্রথমে তাদের
সংসারে অশান্তি ছিল। সেটা ভেবেই দীপাকে খুব
কড়া পাহারায় রাখত। কারো সাথে প্রেমে জড়াতে
দিত না। কিন্তু সেই কয়মাস দীপার বাবা
ব্যাবসায়িক কাজে বাইরে যায়। এই সুযোগে দীপা
আমার প্রেমে পড়ে যায়।
যাক যা হবার হইছে। শেষে কাংখিত সময় পাড় হইল।
দুই মাস পরে আমার হাতে তুলে দিল দীপাকে। বাপ,
শ্বশুড়, জামাই তিনজনেই ব্যাবসা করি। কিন্তু
তিনজনের ই ব্যবসার স্থান ও কোয়ালিটি আলাদা।
বাপ আর শ্বশুড় শহরে ব্যবসা করে আর আমি চলে
গেছি গ্রামে। এদের চাপাচাপির মাঝে আমি
থাকতে পারব না। নিজের ব্যবসা নিজেই
দেখাশোনা করব।
.
সময় যে কিভাবে কেটে যায় কিছুই বুঝি না। দীপার
ব্যথা উঠেছে। তাড়াতাড়ি এম্বুলেন্স খবর দিয়ে
দীপাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। দীপা একটা
ফুটফুটে গোলাপ ফুল উপহার দিল। মানে আমাদের
একটা মেয়ে হয়েছে। ঠিক গোলাপের মতই। অনেক
ফর্সা ঠোট দুটো রক্তরাঙা।
মাস খানেক পরে সবাই তার নাম ঠিক করার জন্য
বিজি হয়ে গেল। কি রাখা যায়! কি রাখা যায় এই
চিন্তা নিয়েই সবাই ব্যস্ত।
অনেকেই অনেক রকমের নাম রাখতেছে কিন্তু
কারোরটা ভাল লাগছে না। আম্মা একটা নাম
রাখছে অনিতা। সেই নামটা আমার শ্বাশুড়িরও খুব
পছন্দ হল।
দুই আম্মা মানে আমার আম্মা আর শ্বাশুড়ি আম্মা
মিলে দুজনেই আমার কাছে আসল। আমার অভিমত
নেবার জন্য। দীপা এক কথাই বলে দিছে। দীপ যা
নাম রাখবে সেটাই আমিও রাখব।
আম্মা বলল,
:- আমরা তোর মেয়ের জন্য একটা নাম ঠিক করেছি।
:- কি নাম? ( যদিও জানি )
:- অনিতা।
:- বাহ! খুব সুন্দর নাম।
আমার কিছু একটা না বলা কথা আমার শ্বাশুড়ি ধরে
ফেলল। তাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
:- দীপ! তোমার কি এই নামে কোন আপত্তি আছে?
আমি আমতা আমতা করে উত্তর দিলাম।
:- হ্যা। না মানে।
:- বলে ফেল। কি নাম রাখতে চাও।
:- আমি অনেক ভেবে চিন্তে ওর নাম দীপান্বিতা
রাখতে চাচ্ছি। এই নামের মাঝে অনেক বিশেষত্ব
আছে। যেমন আমার নাম দীপ, ওর নাম দীপা আর
আপনারা পছন্দ করে নাম রেখেছেন অনিতা। আমার
মেয়ের নামের মাঝেই দেখেন সবারি কিছু মিল ও
পছন্দ ঠিকই রয়ে গেল। দীপান্বিতা নামের মাঝে
আমার ও দীপার নাম ও রয়ে গেল। আপনাদের পছন্দ
করা নামও রয়ে গেল।
আম্মা বলে উঠল।
:- বিয়ানী সাহেবা। দীপ কিন্তু ঠিকই বলেছে।
:- হ্যা। ঠিকই বলেছে। তাহলে আমার নাতনির নাম
ওটাই রাখতেছি। কি বলেন বিয়ানী সাহেবা?
:- আমিও একমত।
.
সব আলোচনা – পর্যালোচনা সাপেক্ষে মেয়ের নাম
দীপান্বিতাই রাখা হল। দীপান্বিতা পরিবারের নতুন
সদস্য হয়ে এসে সবার মন খুশীতে ভরিয়ে তুলল। সবাই
ওকে নিয়ে মেতে থাকে। পাশের বাড়ির মেয়েরাও
বাদ যায় না। অনেক পিচ্চি আছে যারা
অপরিচিতদের কোলে গেলে খুব কান্না করে কিন্তু
দীপান্বিতা তেমন নয়। শুধু ব্যাথা পেলে আর ক্ষুধা
লাগলে কান্না করে। তখন সামলানো খুব কঠিন হয়ে
যায়। তখন আবার দীপাকে আমার হেল্প করতে হয়।
দীপা পরিবারের সবার যত্নেই বড় হতে থাকে।
.
আট বছর পর।
.
হঠাৎ একটা আননোন নাম্বার থেকে কল আসল। পরে
জানলাম। সে দীপান্বিতার ম্যাম।
আমাকে সালাম দিল।
:- আসসালামু আলাইকুম।
:- ওয়া আলাইকুমুস সালাম।
:- আজকে তাড়াতাড়ি স্কুল ছুটি হয়ে গেছে।
দীপান্বিতা কে নিয়ে যান।
:- ওহ নো। আমি আসছি।
.
ফোনটা রেখে বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। গিয়ে
দেখি। সেই ম্যাম আর আমার মেয়ে একটা গাছতলায়
বসে গল্প করছে। আমি উনাকে সম্মান পূর্বক ধন্যবাদ
দিয়ে দীপান্বিতাকেকে নিয়ে আসলাম। বাসায়
এসে ওকে গোসল করালাম। খাইয়ে দিয়ে ঘুম
পাড়ালাম।
ওহ হ্যা পাঠক দের তো একটা কথা বলাই হয় নি।
গাড়ি নিয়ে আমি, দীপা আর দীপান্বিতা ঘুরতে
গিয়েছিলাম। ওর ( দীপান্বিতার ) দাদুর বাসায়।
ফিরে আসার সময় রোড এক্সিডেন্ট করে দীপা
মারা যায়। বেঁচে যায় এক বছরের ছোট মেয়ে আর
তার বাবা মানে আমি। আল্লাহ মনে হয় এমটাই
চেয়েছিল তাই আমাদের মাঝখান থেকে দীপাকে
উঠিয়ে নিল। হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও পাই নি।
মাথায় আঘাত লাগার ফলে তাড়াতাড়িই মারা যায়
দীপা। আধা ঘন্টা পরেও আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না
যে, দীপা আর আমাদের মাঝে নেই।
.
আমি দীপাকে ঘুমে রেখে কাজ করতেছি। ঘন্টা
তিনেক পরে খুব চিৎকার শুরু করে। আর পেটে হাত
দিয়ে মোচড়াতে থাকে। এমনভাবে দীপাও কান্না
করত। অসহ্য পেট ব্যাথা করত। তাই দীপান্বিতা কে
হালকা সেক দিলাম। তাতে ব্যাথাটা উপশম হয়ে
যায়।
দীপান্বিতা খেতে খেতে আমাকে জিজ্ঞেস করল।
:- আব্বু! আব্বু! ও আব্বু শোননা?
:- জ্বী মামনি বল।
:- আমার আম্মু কই?
:- উপরে চলে গেছে।
:- কতদিন হয়ে গেল আসছেই না। তোমার সাথে রাগ
করে আর কি আসবে না?
:- না আম্মু। যেখানে গেছে ওখানকার লোকেরা
সেখান থেকে কাউকে আসতে দেয় না।
:- আমি আম্মুকে আনতে যাব। তুমি আম্মুকে আচ্ছামত
বকা দিবে। কি পারবে না আব্বু?
:- স্যরি দীপান্বিতা।