Home ছোট গল্প সুখের খোঁজ

সুখের খোঁজ

সেদিন মিলি এসে খুব অবাক করেই বলেছিল, “আচ্ছা তোমার এই দাড়িগুলো কেটে ফেলা যায় না? কয়েকটা দাড়ি, কী দরকার রাখার? কেটে ফেলো বিশ্রী লাগে। ”
আমি বললাম “এটা নবীর সুন্নত। কাটলে বড় গুনাহ হবে। ”
“এত সুন্নত খুঁজলে মাদ্রাসায় পড়তে।”
” মাদ্রাসায় না পড়েও মুমিন হওয়া যায়।”
“তোমার চিন্তা ভাবনা আজও সেকেলে রইল। আমি এতকিছু বুঝিনা দাড়ি কেটে আরো স্মার্ট না হলে আমার পক্ষে সম্ভব না রিলেশন রাখা।”
আমি বললাম, ” প্রথমত আমি দাড়ি কাটবো না। আর দ্বিতীয়ত আমি যেমন আছি তেমনই থাকবো। অতি আধুনিক হতে আমি পারবোনা।”
তখন মিলি বললো, “আই এম সরি টু সে আমার পক্ষে সম্ভব না এই রিলেশন রাখা।”
ঠিক এভাবেই প্রায় তিন বছরের সম্পর্ক আমাদের নষ্ট হয়। শুধু দাড়ির ওজুহাতে নয় মিলি দিনদিন অতি আধুনিক হতে চলেছিল তখন, তার ঠিক এমন একটি মানুষের প্রয়োজন ছিল যে ঠিক তার মত অতি আধুনিক। গ্রামের এই সেকেলে ছেলের সাথে রাজধানীতে চলে যাওয়া একটা অতি আধুনিক মেয়ের মিল থাকতে পারেনা। ব্রেকাপের পর আমার মন যে ভালো ছিল তেমনটাও না প্রিয় মানুষ হারানোর বেদনা আমার নীল আকাশটাকেও কালো করে দিয়েছিল। লুকিয়ে মাঝেমধ্যে কান্না করলেও আল্লাহর উপর ভরসা রাখতাম। নিশ্চয়ই উনি আমার ভালো কিছু করবেন। আর এই দুয়াও করতাম মিলি যেন সুখে থাকে যেখানেই থাকে।
এসব ছিল ২০১০ সালের ঘটনা। গ্রামের একটা ছোট বিদ্যালয়ে আমি এখন শিক্ষকতা করি। সবাই আমাকে হুজুর, স্যার হুজুর স্যার বলে ডাকে। বেতন যেমনি পাই না পাই সম্মান ঠিকই পাই।
অদ্ভুতভাবে মিলি এখন আর সেই মিলি নেই । খুব কষ্ট লাগে ওর কথা শুনে। তিনবার ডিভোর্স হয়েছে। তার মাঝে একবার নাকি কোন এক বড়লোকের সাথে বিবাহ হয়েছিল। তিন মাস সংসার করার পর ডিভোর্স হয়ে গেলে সে বিষ খায়। কোনমতে বাঁচতে পেরেছিল সেবার।
গত ঈদে উজানপাড়ার বড় মাঠের পাশে দেখেছিলাম মিলিকে। আমায় হয়তো চিনেনি। চুলগুলো এলোমেলো, বেখেয়ালিভাবে কি যেন বলে বলে হাঁটছিল । কেন জানি ওকে এ অবস্থায় দেখেই আমার কান্না চলে আসছিল। আল্লাহর কাছে আবারো দোয়া করেছিলাম মিলি যেন সুখী হয়। আল্লাহ তুমি সহায় হও।
আমার মত ক্ষুদ্র মানুষের ক্ষেত্রে হাজারো দুঃশ্চিন্তা নিয়ে দালানের মালিক হওয়ার চেয়ে দুশ্চিন্তাহীন টিনের চালা ভালো। আমার প্রচুর টাকার দরকার নেই সুখী হওয়ার জন্য। প্রাত্যাহিক কাজকর্ম করার জন্য, বেঁচে থাকার জন্য যে সামান্য টাকাটুকু দরকার সেটুকু হলেই আলহামদুলিল্লাহ।
আজ রবিবার, বাজার থেকে বোয়াল মাছ এনেছি। আমার স্ত্রী কুলসুম রান্না বসিয়েছে। রান্নার সুঘ্রাণ চারদিকে বেরিয়েছে। কয়েকজন বন্ধু আজকে খেতে আসবে। ওদের নিয়ে মাঝেমধ্যেই খাওয়া হয়। আমি এটা জানি প্রতিবারের মতো এবারও তারা যাবার বেলা বলবে, ” দোস্ত ভাবিকে কি আমরা আর এ জীবনে দেখতে পারবো না? ”
আসলে করার কিছু নেই আমার স্ত্রী পরপুরুষের সামনে কখনোই যায়না। এমনকি প্রয়োজন ছাড়া পরপুরুষের সাথে আড়াল থেকে কথাও বলে না।
” একটু শুনবেন।”
আমার স্ত্রী ডাকছে।
” হ্যাঁ বলো।”
“একটু খেয়ে দেখবেন কেমন হয়েছে তরকারিটা?”
“মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ। তোমার রান্নার কোন তুলনাই হয় না।”
ও মুচকি হেসে বললো “আপনার প্রশংসা শুনতে আমার ভালো লাগে। মেহেরবানী করে আবার বলবেন।”
আমি আবার বললাম “মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ। তোমার রান্নার কোন তুলনাই হয়না। ”
কুলসুম মুখ চেপে ধরে হাসছে। জোরে হাসলে আবার কেউ শুনে ফেলে কিনা সে সংশয় ওর মধ্যে সবসময় কাজ করে।
রান্না ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় এসে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি, নিজের সুখের জন্য অন্যকে দুঃখে ফেলে যাওয়া মানুষগুলো আসলেই কী পরে সুখী হতে পারে? আমার জানা নেই।