হঠাৎ দেখা

সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। সিলেট যেতে হবে একটা মিটিং এ আ্যটেন্ড করার জন্য। রাতের টিকিট ছিল আমার। স্টেশনে এসেছি। কিন্তু মনটা কেমন যেন বিমূর্ষ হয়ে আছে। আমি আমার কামরায় উঠলাম। আমার সীটে বসেছিলাম।
ট্রেনটি তার নিজ গতিতে এগিয়ে চলছে। হয়তো কোনো একসময় থেমে যাবে। নেমে যেতে হবে আমাকে। এটাই নিয়ম।
একজোড়া চোখ আমাকে অস্থির করে তুলেছে। আমার খুবই পরিচিত চোখ। আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে ৫ বছর আগের কথা।
তার‌ও কি মনে পরছে কথা গুলো? নাকি আমাকে ভূলে গেছে সে?
হ্যাঁ, ভূলে যাবেই না কেনো? সেই ৫ বছর আগের ঘটনা। তাছাড়া ভূলে যাওয়ার আরো কারণ আছে। সে তো ভূলে যাওয়ার জন্যেই আমার হাতটা ছেড়ে দিয়েছিল সেদিন।
শত চেষ্টা করেও আটকাতে পারিনি তাকে।

৫ বছর আগের কথা…..
আমি তখন প্রথম বর্ষের ভর্তি হয়েছি। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
ক্যাম্পাসে যাওয়ার পর‌ই একটা মেয়েকে চোখে পরে। খুব চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে।
হাসিখুশি একটা মেয়ে। যদিও বুঝতে একটু সময় লেগেছিল।
প্রথম ক্লাস, সবার পরিচয়ের পালা। তখন জানতে পারলাম মেয়েটির নাম রূপা।
অসম্ভব রূপবতী ছিল সে।
কখন যে মনের মাঝে জায়গা করে নিল বুঝতেই পারিনি। আমি খুব একটা মিশুক প্রকৃতির না।
রূপা অনেকবার এসেছে আমার সাথে কথা বলতে। কিন্তু আমি লজ্জায় তার সাথে কথা বলতে পারিনি। আমার এমন অবস্থা দেখে সে হেসেছে।
অসম্ভব সুন্দর তার হাসি। মায়া লেগে যায়। এভাবে কাটতে থাকে দিনগুলো।
৭ মাস যেতে না যেতেই সে আমাকে ভালোবাসার জন্য প্রস্তাব দেয়।
আমিও তাকে পছন্দ করতাম,তাই না করতে পারিনি। আমাদের দুজনের সম্পর্ক
অনেক মধুর ছিল। দুষ্টু মিষ্টি আবদারে ঘেরা। আমি কখনো তাকে স্পর্শ করিনি।
কখনো ইচ্ছাও করেনি। হতে পারে একেক জনের ভালোবাসা একেক রকম।
পাশাপাশি হেঁটেছি, কখনো আবদার করিনি, তোমার হাতটা ধরতে দাও না প্লিজ।
সেও কখনো এসব নিয়ে বলেনি।
সময়টা বেশ ভালই কাটছিল আমাদের দুষ্টু মিষ্টি ভালোবাসায়।
একবার ভার্সিটিতে একটা অনুষ্ঠান হচ্ছিল। আমি ছিলাম হলুদ পাঞ্জাবী পরা,
আর রূপা এসেছিল নীল রঙের একটা শাড়ি পরে।
মনে হচ্ছিল যেন আসমান থেকে নীল পরী নেমে এসেছে। দ্বিতীয়বারের মতো ওর প্রেমে পরে গেলাম আমি। সেদিন প্রথম ও আমার হাতটা ধরেছিল।
হাত ধরে দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলাম। অনেক মায়াবী লাগছিল ওকে।
তার কিছুদিন পরের কথা.. ও আমাকে এসে বলল ,

রূপা- চলো আজ ঘুরতে যাব।
হিমেল- কেনো ক্লাস করবে না?
রূপা- থাক না আজ।
হিমেল- ঠিক আছে। চলো।
রূপা- চলো।
আমরা রিকশায় করে পুরো শহরটা ঘুরে ছিলাম।
রাস্তার মাঝখানে রিকশা থামিয়ে বলল, তার নাকি ক্ষুধা লেগেছে।
আমি বললাম চলো তাহলে কোনো রেস্টুরেন্টে যাই।
সে উত্তরে যা বলেছিলো সেটা শুনে অনেক হেসেছি আমি।
সে বলেছিল ফুচকা খাবে সে। ক্ষুধাটা তার ফুচকার‌ই ছিল। আমি হেসেছি বলে সে রাগ করেছিল। কিন্তু ফুচকা কিনে আনার পর‌ই তার রাগ উধাও।
ফুচকার ঝালে সে যখন কাতর আমি নির্বাক হয়ে তাকিয়েছিলাম তার দিকে।
কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছিল তার। রুমাল বের করে মুছে দিয়েছিলাম। রূপা
হেসেছিল সেদিন। আমি আবারও তার প্রেমে পরে যাই।
কখনো সে আমাকে কষ্ট দেয়নি।
একবার আমার জ্বর হয়েছিল। সে নিজে আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল।
ওষুধ পত্র সব সে নিজ খরচে এনেছে। আমি শুধু রূপার দিকে তাকিয়ে কাদছিলাম সেদিন।
নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। আমি এমন একজনকে পেয়েছি যে আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝে না।
বিপত্তিটা ঘটেছিল চতুর্থ বর্ষে। আমাদের সম্পর্কটা এভাবে শেষ হবে আমি কখনো ভাবিনি।
একদিন রাতে রূপা আমকে ফোন করে বলল আমার সাথে তার জরুরি কথা আছে।কাল দেখা করতে হবে।

ক্যাম্পাসে সে বসে আছে। আমি চুপ করে তার পাশে গিয়ে বসলাম।
মনটা কেমন যেন করছে। মনে হচ্ছে আমি রূপাকে হারাতে বসেছি। আমি নিরবতা ভেঙ্গে রূপাকে জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছো? সে উত্তরে বলল..

রূপা- আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
আমি কি বলব বুঝতে পারছি না। বুকটা ধক করে উঠল।
হিমেল- কি করে হলো? আগে তো কিছু বলোনি।
রূপা- কাল‌ই হয়েছে। ছেলে বিসিএস ক্যাডার।
হিমেল- তুমি কি বিয়েতে রাজি?
রূপা- এটা কেমন কথা হিমেল? আমি আমার পরিবারের বিরুদ্ধে যেত পারব না।
হিমেল- প্লিজ রূপা। আমি সেটা বলিনি। আমাদের এত বছরের সম্পর্কের কথা ভুলে যাবে?
রূপা- উপায় নেই।
হিমেল- আর মাত্র কয়েকটা দিন। তারপর তো আমিও চাকরি পাব ।একটু ভেবে দেখ না রূপা প্লিজ!!
রূপা- এটাই আমাদের শেষ দেখা।
হিমেল- রূপা!
রূপা উঠে যায়, রূপা কান্না করছিল সেদিন। হিমেলের যতটা কষ্ট হচ্ছিল রূপার‌ও ততোটাই কষ্ট হচ্ছিল। রূপা চলে যাওয়ার পর হিমেল ক্যাম্পাসে বসে অনেক্ষণ কান্না করেছিলাম।
সত্যিই তাই এরপর আর দেখা হয়নি রূপার সাথে।

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে চোখে পানি এসেছে আজ। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। আজ আবারো যেন বুকের বাঁ পাশের ব্যথাটা অনুভব করছি। হয়তো নিয়তি কখনো চায়নি আমাদের মিলাতে। আমি রূপাকে কখনো দোষারোপ করিনি। কারন সেও আমাকে ভীষণ ভালোবাসত।
হয়তো পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করেছে আমাকে ছাড়তে। আর আজ ৫ বছর পর দেখা।
কিন্তু সে আর আগের মতো রূপবতী নেই। কেমন যেন অসহায়ত্বের ছায়া ঘিরে ধরেছে তাকে।
খুবই কষ্ট হচ্ছে রূপাকে এভাবে দেখতে। চোখ যেন বাধা মানছে না। খুব ইচ্ছে করছে তাকে একবার জড়িয়ে ধরতে। একবার জিজ্ঞেস করতে, সে কেমন আছে?
কিন্তু প্রকৃতি তাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
আমি আমার সীটটা পরিবর্তন করে বসলাম। কারন তাকে আর আমি দেখতে চাই না।
তার মুখটা আমাকে বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছে সে আমার নেই।

আমি আর ভাবতে চাই না। হয়তো এরকম সত্যিকারের সম্পর্কগুলো সবসময় অপূর্ণই থেকে যায়।